আজ ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মধুপুর বনে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজরিত সেই ডাকবাংলো


আলকামা সিকদার : ১৯৭১ সালের জানুয়রী মাস। বেলা ফুড়ায়নি, দ্বিপ্রহর তখনো কুয়াশায় ঢাকা সূর্য আকাশে উঁকি দেয়নি। কালো রঙ্গের জিপ গাড়ি থেকে নেমে পা রাখলেন বাংলোর সবুজ লেনে। সফেদ পাঞ্জাবির ওপর চাপানো কালো কোট। গলায় জড়ানো নকশাকার পাতলা চাদর। ততক্ষণে সশস্ত্র বনকর্মীরা তট¯’ হয়ে উঠেছেন। সামনে এগিয়ে কেতাদুর¯’ কায়দায় শ্রদ্ধা জানালেন দীর্ঘাঙ্গী এক মহামানবকে।
এ ভাবেই ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা ডাকবাংলোয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমনের বর্ণনা দি”িছলেন তৎকালীন মধুপুর বনে কর্মরত বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মী মোশারফ হোসেন।
বঙ্গবন্ধু তখন বাঙ্গালি জাতির প্রাণের অবিসংবাদিত নেতা। সত্তরের ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর বাঙ্গালি জাতি তখন স্বপ্ন দেখছিলেন এ মহানায়ককে ঘিরেই । মোশারফ হোসেন তখন দোখলা ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। জিজ্ঞেস করলে স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন (অব.) মনসুর আলী এবং টাঙ্গাইলের গোপালপুর-কালিহাতী থেকে নির্বাচিত এমএনএ হাতেম আলী তালুকদার উপ¯ি’ত ছিলেন।
ডাকবাংলোর পাশেই শ্বেতপাথরে খোদাই করা শিলালিপিতেও একাত্তর সালের ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর এ বাংলোতে অব¯’ানের কথা উল্লেখেও তাই প্রমাণ করে।
মোশারফ হোসেন আরো জানান, বঙ্গবন্ধু এখানে অব¯’ানকালে সকালে রুটি-ডিম, দুপুরে মোরগ পোলাও এবং রাতে মাছভাত খেয়েছেন।
মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জেলা পরিষদের সদস্য খন্দকার সফিউদ্দীন মনি বঙ্গবন্ধুর আগমনের সত্যতা স্বীকার করে জানান, দেশের সেই উত্তাল সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রিয় সহচর নিয়ে গোপন শলাপরামর্শের জন্য এখানে এসেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষি দেয়।মধুপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক আব্দুর রহমান বিএসসিকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ¯’ানীয় জাতের কলা উপহার দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
আচিকমিচিক সোসাইটির পরিচালক গারো নেত্রী সুলেখা ম্রং জানান, বঙ্গবন্ধু গারো গ্রাম চুনিয়া ঘুরে দেখেন। সে সময় বঙ্গবন্ধুকে গারোরা ভুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সংবর্ধনা দেয়।
সুলেখা আরও জানান, তিনি তখন এ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। সংবর্ধনায় সভাপতিত্ব করেন প্রয়াত গারো নেতা পরেশ মৃ। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর বঙ্গবন্ধু সুলেখাকে মাথায় হাত দিয়ে আদর করেন। তাকে ৫০০ টাকা বকশিশ দেন। সেই বকশিশের টাকা খরচ না করে মধুপুর সোনালী ব্যাংকে ডিপোজিট রাখেন। পরে সুদের টাকায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ফরমফিলাপ করেন।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, বঙ্গবন্ধু এখানে অবস্থানকালে বাংলোর চত্বরে একটি রক্তচন্দন ও আমগাছ রোপণ করেন। কালের করালগ্রাস পেরিয়ে এখনো তা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু যে চেয়ার ও টেবিল ব্যবহার করেছিলেন বন বিভাগ এখনো তা সংরক্ষন করে আগলে রেখেছে।
তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকার-আলবদররা দুই মাসের জন্য বাংলোতে আস্তানা গেড়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত খাটপালঙ্ক ও আসবাবপত্র ধ্বংস করে।মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফা জানান, জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার স্মৃতিধন্য এ ডাকবাংলোটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং এর পাশে আরেকটি পৃথক বাংলো করার কথা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত এ জায়গাটি এবংকি এ ডাকবাংরোল বিভিন্ন কিছু দেখতে এখন জনসাধারণ আসে প্রায় বছরের সব সময়ই । তাছাড়া পর্যটন মৌসুম শীতকালে প্রতিনিয়তই স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ অনেক লোক জনই আসে এ সকল স্মৃতি বিজরিত ঐতিহাসিক জায়গা দেখতে ।