আজ ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ঘাটাইলে চলছে মাটি কাটার মহোৎসব

ঘাটাইল প্রতিনিধিঃ টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ফসলি জমির মাটি ও লাল মাটির পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। বন ও পরিবেশ আইন অমান্য করে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় একটি চক্র দেদারছে মাটি কেটে বিক্রি করলেও কোনো আইনি পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রশাসনের। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা আদায় করলেও তা আমলে নিচ্ছেন না মাটি ব্যবসায়ীরা।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে আইন অমান্য করে এস্কেভেটর (ভ্যাকু) দিয়ে ফসলি জমির টপসয়েল ও লাল মাটির পাহাড় কাটা হচ্ছে। ফসলি জমির মাটির বেশিরভাগ ব্যবহৃত হচ্ছে ইটভাটায়। উপজেলার চানতারা গ্রামে রয়েছে ১০-১২টি ইটভাটা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ফসলি জমির টপসয়েল কেটে ট্রাক দিয়ে এসব ভাটায় ইট প্রস্তুতের জন্য মাটি জমা করা হচ্ছে। একইভাবে মাটির টপসয়েল কেটে উপজেলার দেউলাবাড়ি, জামুরিয়া, পেচারআটা, ধলাপাড়া, নিয়ামতপুর, রসুলপুর, সিংগুরিয়া, মোগলপাড়াসহ ৬৮টি ইটভাটায় মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাটি ব্যবসায়ীরা এক শ্রেণীর দালাল দিয়ে সাধারণ কৃষককে লোভে ফেলে ফসলি জমির মাটি বিক্রিতে উৎসাহিত করছেন। আর কৃষকরা লোভে পড়ে নগদ টাকার আশায় ফসলি জমির মাটি বিক্রি করে দেন। ৮-১০ ফুট গভীর করে মাটি কাটার ফলে অনেক জমিই ডোবায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিমত, প্রতিবছর শত একর ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। যার কারণে দিন দিন আবাদী জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে।

পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে বাড়ি নির্মাণ, ডোবা ভরাট, রাস্তা সংস্কার, রাস্তা নির্মাণ, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ এবং ইটভাটাসহ বিভিন্ন কাজে। অনেকে আবার অনুমতি ছাড়াই পুকুর কাটার কথা বলে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। শুধু দিনের আলোয় নয়, রাতের আধারেও চলে লাল মাটির পাহাড় কাটা। প্রশাসনের নজরদারি বেশি থাকলে মাটি ব্যবসায়ীরা রাতের সময়কে উত্তম সময় হিসাবে বেছে নেন। ইতিমধ্যে ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলার চেরাভাঙ্গা এলাকায় বড় বড় লাল মাটির টিলা রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে সাবাড় করা হয়েছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬ (খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা নিষিদ্ধ।

উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের মলাজানি এলাকায় এক বিশাল আকার পাহাড়ের টিলা কেটে সমতল ভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১২ জানুয়ারি জুগিয়াটেংগর গ্রামের মাটি ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিককে লাল মাটির টিলা কাটার অপরাধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যম ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। কিন্তু কিছু দিন বিরতি দিয়ে এই এলাকায় আবার টিলা কাটা শুরু করেছেন অন্য মাটি ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া গত জানুয়ারি মাসে ফসলি জমির মাটি ও পাহাড় কাটার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫ জন মাটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের জরিমানা আদায় করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলার রসুলপুর, পেচারআটা ও পৌরসভা এলাকায় এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দেউলাবাড়ি ও দিঘলকান্দি এলাকায় দুই মাটি ব্যবসায়কে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তার পরও মাটি ব্যবসায়ীদের ঠেকানো যাচ্ছে না।

এলাকাবাসী জানায়, স্থানীয় প্রশাসন জেল জরিমানা করার পর কিছু দিন বিরতি দিয়ে আবার পুরোদমে মাটি কাটার কাজ শুরু করেন মাটি ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক মাটি ব্যবসায়ী কৌশল পরিবর্তন করে দিনের বদলে রাতের বেলায় লাল মাটির পাহাড় কেটে সাবাড় করছেন। তাদের অভিযোগ গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মাটির ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক নির্মাণের দুই এক বছরের মধ্যে তা ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বনবিভাগের আওতাধীন কোনো জমি থেকে মাটি কাটা হচ্ছে না এবং এমন কোনো অভিযোগও আমার কাছে নেই। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
টাঙ্গাইল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া ফসলি জমির মাটি ও পাহাড়ের লাল মাটি কাটা অবৈধ। অভিযোগ পেলে এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাটি কাটা বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এ ব্যাপারে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap