আজ ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সময়ের আবর্তে কালিহাতীর মৃৎশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ প্রাচীনকাল থেকে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও নানান ব্যবহারিক সামগ্রীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির অস্থিত্ব। শত শত বছর ধরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে মৃৎশিল্প গড়ে উঠেছে।

প্লাস্টিকের তৈরি বাহারি তৈজসপত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার। ফলে সময়ের আবর্তে জনপ্রিয় এ শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কালিহাতীতে এ শিল্পটি টিকে রয়েছে কোনরকমে। তবে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের এই পেশা এখনো ধরে রেখেছেন উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার কুমার পরিবার।

এখনো তাদের নিপুন হাতে তৈরি করছেন মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন, হানকি (খাবার প্লেট), গ্লাস, কলস, সরা, সুরাই, পেয়ালা, মটকা ও পিঠা তৈরির ছাঁচ, নানান রকম খেলনা ইত্যাদি।

উপজেলার কালিহাতী পৌরসভার উত্তর ও দক্ষিণ বেতডোবা, কোকডহরা, বল্লা, নাগবাড়ী, নারান্দিয়া ইউনিয়নের প্রায় কয়েক হাজার কুমার পরিবার মাটির তৈরি তৈজসপত্র তৈরি করে থাকেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাটির তৈরি তৈজসপত্রকে যুগোপযোগী করে তুলতে পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে পরিবেশের উপর প্লাস্টিকের যে বিরূপ প্রভাব তা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনও উপজেলা সদরের উত্তর ও দক্ষিণ বেতডোবার ৭০টি পরিবার কোকডহরা ইউনিয়নের ৫০টি পরিবার, বল্লা পাল পাড়ার ৯০টি পরিবার, নাগবাড়ী ইউনিয়নের ঘোনা বাড়ীর ১৬পরিবার, নারান্দিয়া ইউনিয়নের পালিমা ও পাথালিয়া গ্রামের প্রায় ১০০টি কুমার পরিবার বসবাস করছেন।

উত্তর বেতডোবার মোহন পালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পেশা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কুমারদের। এই শিল্পতে টিকে থাকা কুমাররা বলছেন, এ সম্প্রদায়ের লোকজনেরা মাটির তৈরি করা পাকপাতিল, ঠিলা, কলসি, পুতুল, কুয়ার পাট, খেলনার সামগ্রী, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক ইত্যাদি হাট বাজারে বা গ্রামে গ্রামে বড় ঝাঁকা বোঝাই করে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন।

ছয়মাস ধরে তারা মৃৎশিল্প তৈরি করে আর ছয়মাস বিভিন্ন কায়দায় বিক্রি করতেন। দিন যতই যাচ্ছে, ততই বাড়ছে আধুনিকতা। আর এই আধুনিকতা বাড়ার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি শিল্পপণ্যগুলো।

কোকডহড়ার সুরেশ পাল জানান, ব্যবসা মন্দার কারণে আমাদের এখানকার মৃৎ শিল্প প্রস্তুতকারী শতাধিক পরিবার পৈত্রিক ভিটা পর্যন্ত ছেড়ে চলে গেছে। প্রায় ৪০০ পরিবারের মতো অন্য পেশায় চলে গেছে। এখন বাপ-দাদার এই পেশা ধরে রেখেছে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার।

বাড্ডা পাল পাড়ার মন্টু পাল (৮০) এবং খুশিমোহন পাল (৭০) বলেন, আমি ছোট সময় থেকেই মাটি তৈরী শিল্পের কাজ করছি, আমাদের এলাকায় ৫০টি পরিবার একই কাজ করে।

বর্তমানে কাঠের ও মাটির দাম বেশি হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বাজারে মাটির পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের এ ব্যবসা এখন হুমকির মুখে। ভবিষ্যতে এ পেশা থাকবে কি না তা নিয়ে নিজেরাই রয়েছেন সংশয়ে।

কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী কোকডহড়ার রঞ্জনপালের মেয়ে শোভা বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও বাজার-বিপণন ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap