আজ ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মধুপুরে আগর বাগান করে ফতুর হয়েছে অনেকে

মধুপুর প্রতিনিধিঃ সোনাঝরা গাছ। ১০ বছরে মাত্র ১০টিতেই কোটিপতি। বাজারজাতকরণেও সমস্যা নেই। কারখানামালিকরা বাড়ি এসে নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যাবেন। বারান্দার বেঞ্চিতে আয়েশি পা তুলে কাঁচা টাকা গুনবেন শুধু। বনকর্মীদের এমনতরো আশ্বাসে এক যুগ আগে দেড় বিঘায় আগর গাছ লাগিয়েছিলাম। সে গাছ এখন গলার কাটা।সোনার দামে তো দূরের কথা সস্তা জ্বালানি কাঠ হিসেবেও বিকাচ্ছে না।

টাঙ্গাইলে মধুপুর উপজেলায় সরকারি আগর প্রকল্প নিয়ে এভাবেই খেদোক্তি করেন কুড়াগাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং কৃষক লীগ নেতা ফজলুল হক।

শুধু ফজলুল হক নন, চুনিয়ার বাবুল দারু, ফুলবাগচালার জামাল হোসেন, ফেকামারির আবেদ আলী এবং পিরোজপুরের আনোয়ার হোসেনের মতো বহু মানুষ সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের আগর বনায়নে ফতুর হয়েছেন।

জানা যায়, মধুপুরে গজারি গাছ নিধন করে বিদেশি প্রজাতির বাণিজ্যিক বনায়ন শুরু নব্বইয়ের দশকে। প্রথমে বনভূমিতে একক রাবার চাষ এবং পরে মিশ্র সামাজিক বনায়নে আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস ও মেনজিয়ামের পর আগর। মধুপুরের চারটি রেঞ্জে ২০০৬-১২ পর্যন্ত ৭৮ একরে অংশীদারিত্বের আগর বাগান করা হয়।

গবুদিয়া গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, বনকর্মীরা অফিসে ডেকে নিয়ে আগর চাষে প্রশিক্ষণ দেন। বলা হয়, ‘আগর চাষ সবচেয়ে লাভজনক। এর কাঠ বিশেষ কায়দায় খণ্ডবিখণ্ড ও জ্বাল দিয়ে নির্যাস বাষ্পীভবন ও শীতলীকরণের মাধ্যমে সুগন্ধী আতর, ওষুধ, সাবান, শ্যাম্পু, পারফিউম এবং উচ্ছিষ্ট আগরবাতি বানানোর কাজে ব্যবহূত হয়। তাই আগর চাষে তাদের ভাগ্য বদল হবে।’

মধুপুর রেঞ্জের ফরেস্টার আমিনুর রহমান জানান, আগর প্রকল্পে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাগান হয়। আগর গাছ পরিপক্ব হতে লাগে কমপক্ষে ৩০ বছর। তাই অল্প দিনে গাছ যাতে উৎপাদনক্ষম হয় সেজন্য গাছের বয়স পাঁচ বছর হওয়ামাত্র গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত অনেকগুলো লোহার পেরেক ঢুকানো হয়। এতে গাছের ক্ষত স্থানে কালো রং ধারণ করে আগর সঞ্চিত হতে থাকে।

মধুপুরে আগর গাছ প্রসেসের কারখানা নেই। সিলেটের কুলাউড়ায় কারখানা থাকলেও ফরেস্ট ট্রানজিট রুলের কারণে সেখানে গাছ সরবরাহ করা কঠিন। তাছাড়া বনবিভাগ বাগানের আগর গাছে পেরেক কর্ম করেনি। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ না পাওয়ায় অংশীদারিত্বের আগর বনায়নের দলিল এলাকাবাসীকে হস্তান্তর করা যায়নি। তাই বাগান নিলামও দেওয়া যাচ্ছে না।

এমতাবস্থায় হিস্যা বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তায় হতাশ অংশীদাররা বাগান দেখভাল বন্ধ করায় বন অপরাধীরা আগর গাছ কেটে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করছে।

দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, আগর বাগান নিয়ে বনবিভাগ পড়েছে মহাঝামেলায়।

পিরোজপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, বনবিভাগের সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা আগর ফাউন্ডেশন ২০০৬-০৮ পর্যন্ত এলাকায় আগর বনায়নে উত্সাহিত করে। তারা শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আগরের বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা দেয়। আবাদি-অনাবাদি এবং বাড়ির আঙিনায় প্রায় ৫ লাখ আগর চারা রোপণ করা হয়। বৃক্ষ বিমার কথা বলে পাঁচ টাকার আগর চারা ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রির পর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে আগর ফাউন্ডেশন গা-ঢাকা দেয়।

চুনিয়ার গারো নেতা বাবুল দারু জানান, সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের ডামাডোলে আনারস আবাদ বাদ দিয়ে দুই একরে আগর বাগান করেন। পনেরো বছরে গাছ পরিপক্ব হলেও প্রসেসিং সেন্টার না থাকায় এবং বনজদ্রব্য পরিবহন নীতিমালা অনুযায়ী সিলেটের কুলাউড়ায় চালান দিতে না পারায় গাছ নিয়ে ভীষণ বেকায়দায় পড়েন। এমতাবস্থায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাগানের সমুদয় আগর গাছ নামেমাত্র দামে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে চালান দেন।

ফুলবাগচালার জামাল হোসেন জানান, দেড় যুগ বাগান দেখভাল ও পরিচর্যার পর প্রসেসিং বা বিকিকিনির সংকটে আগর বাগান বড় লোকসানে ফেলেছে।

টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এডিবির টাকায় গৃহীত বনবিভাগের আগর প্রকল্প সফল হয়নি। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়টিই এখানে প্রধান সমস্যা। তদুপরি অংশীদারিত্ব ও হিস্যা বণ্টন অমীমাংসিত থাকায় সরকারি প্রকল্পের আগর গাছ এখন পরিপক্ব ঝামেলায় রূপ নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ