আজ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

স্মরণীয় হয়ে বেঁচে থাকবেন দেলোয়ার টাংগালা(দাদা ভাই)

ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালা আমাদের দুঃখের অকুল সাগরে ভাসিয়ে চিরবিদায় নিলেন গত ১৫ এপ্রিল বৃস্পতিবার সকাল ৯ টা। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে সুস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সুস্থ হয়েছেন জেনে আমি তার সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছিলাম। আমার সাথে সাক্ষাতের আগেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জীবনাবসানের কয়েকদিন আগে এক দুপুরে তার ঘাটাইলের বাসার পাশ দিয়ে আসছিলাম। বাসার দিকে চেয়ে এক মুহূর্তের জন্য থেমেও গিয়েছিলাম। কিন্তু আকাশে মেঘ থাকায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার তাগিদে তার বাসায় যাইনি। এখন সারা জীবন গ্লানিতে ভোগাবে যে, কেন সেদিন তার সঙ্গে দেখা করে এলাম না।

রোগাক্রান্ত হওয়ার পর থেকে দেলোয়ার টাংগালা ছিলেন ঘাটাইলের নিজ বাসায় ঘরবন্দি। এ সময়ের মধ্যে যেভাবে তার খোঁজ-খবর নেয়া উচিত ছিল তা নেইনি। তার শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়ে সামান্য হলেও দায় মেটাতে পারতাম। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে তার প্রস্থান হয়েছে নীরবে-নিভৃতে।

এরপরও সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের তার সতীর্থদের জানানো প্রয়োজন ছিল।

দেলোয়ার টাংগালার প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী মুর্শেদা দেলোয়ার মুকুল, তিন মেয়ে সুজলা, সুফলা ও শ্যামলা তো শোকাতবদ্ধ ছিলেন। তবে সাহিত্য-শিল্পাঙ্গনের একজন দায়িত্ব নিয়ে দেলোয়ার টাংগালার মৃত্যু সংবাদ সকলকে জানানো উচিত ছিল। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজনে সাহিত্যপ্রেমীরা নেই কেন?

দেলোয়ার টাংগালার ঘনিষ্ঠ অনেকেই তার সাহিত্যের সহকর্মীদের চিনেন। আমরা আশা করছিলাম তারা আমাদের প্রিয় ছড়াকারকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দিবেন। ন্যূনতম লোকলজ্জা থেকে বাঁচার জন্য হলেও কেউ এ কাজটি করবেন। যথাসময়ে মৃত্যু সংবাদ না পেয়ে আমার মতো অনেকেই মর্মাহত, বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়েছেন।

সৃজনশীলতার আপন ভুবনে মগ্ন ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালার জন্ম ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলার গালা গ্রামে। তার পিতা ওসমান গনি এবং মাতা মোছাম্মদ জোহরা বেগম। পিতার দেয়া নাম মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। লেখক নাম দেলোয়ার টাংগালা।

টাংগালা মানে টাঙ্গাইলের টাং আর ঘাটাইলের গালা।

ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালা হৃদয়ের জানালা খুলে যতোটুকু দেখা যায় তার চিত্রই এঁকে গেছেন তিনি তার লেখায়। দেখার বাইরে কোন বিষয় তিনি তার ছড়ায় স্থান দেননি। ফলে তার ছড়ায় সকল ক্ষেত্রে বাস্তবতার চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। তার বাস্তবতার আলোকে রচিত ছড়া পাঠ করে পাঠকেরা আনন্দ উপভোগ করেন। সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ভেতর দিয়ে ছড়া লিখেছেন তিনি। যার ভাবার্থ কঠিন নয়। তার ছড়ায় সমাজ বিনির্মাণের গন্ধ পাওয়া যায়।

দেলোয়ার টাংগালা পেশায় ব্যাংকার ছিলেন। কিন্তু তার আপাদমস্তক একজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। পেশাগত কারণে যেখানে তিনি গিয়েছেন সেখানেই সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়েছেন।

সে মধুপুরে কর্মরত থাকার সময় আমি আর বিষ্ণু তার অফিসে হাজির হই। আমাদের দেখে তিনি মহাখুশি। বেশ কিছুদিন দেখা নেই তার সঙ্গে। কথায় কথায় কবি মুজাফফর আলী তালুকদারের কথা উঠলো।

মুজাফফর তালুকদারের মৃত্যু প্রসঙ্গ টেনে আমাদের আনমনা করে তোলেন। মুজাফফর স্যারের মৃত্যু তরুণ সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য ছিল বেশি কষ্টদায়ক। কারণ এমন একজন লেখক ছিলেন তিনি যিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন নবীণ সাহিত্যকর্মী সৃষ্টিতে।

ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালা বললেন, ‘মুজাফফর স্যার চলে গেলেন। তার কথায় হতাশার ভাব। বললেন, ‘তাদের স্মৃতি আমাদের কাছে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর যাচ্ছে ইবা বলি কেন অলরেডি গেছে।’

একপর্যায়ে টাঙ্গাইলের এক বরেণ্য লেখকের লেখার প্রশংসা করছিলেন তিনি। আমরা আগ্রহী শ্রোতা হয়ে তা শুনছিলাম।

আলোচনা শেষ হবার পর বললেন, ‘মুজাফফর স্যারের অপ্রকাশিত গ্রন্থ টাঙ্গাইলের লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস প্রকাশের উদ্যোগ কতদূর এগুলো। তার কথায় উত্তর না দিয়ে বললাম, এটা যাদের উদ্যোগ হচ্ছে তাদের কারো সাথে দেখা নেই কিছুদিন ধরে। তবে যতটা জানি এলেঙ্গা ও ভূঞাপুরে কম্পোজ করা আছে।

আর একটি ঘটনার কথা বললেন ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালা। তা হলো সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্প্রসারণে যারা কাজ করেন তাদের বহু রকম কটাক্ষ শুনতে হয় সভ্য-ভদ্র-সংস্কৃতিবিদ্বেষীদের কাছ থেকে। বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব সৃষ্টিকারী দু-একজন লেখক কেউ তথাকথিত সংস্কৃতিবিদ্বেষীদের কটাক্ষ শুনতে হয়েছে। আরও অনেক কথা আছে যদি কখনও লিখি তবে জানতে পারবে। তার কথাগুলো শুনছি আর ভাবছি।

অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা চলল। আমরা নীরবে তার কথা শুনে গেলাম। তার মুখ থেকে তাদের সময়কার আঞ্চলিক সাহিত্যচর্চার অনেক অজানা কাহিনী জানার অদম্য ইচ্ছা প্রকাশ না করে পারলাম না।

বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনাদের সময়ের সাহিত্য চর্চার ইতিহাস লিখুন না, অনেকটা দাবী ও আবদার মিশিয়ে নিবেদন করলাম। মৃদু হেসে বললেন, ‘অনেক কিছু লেখার ইচ্ছে আছে, সময় পেলে সব লিখে যাব। কিন্তু তার আগেই জীবন অবসান হলো, একজন ছড়াকারের পতন হলো। ইচ্ছেগুলো রয়ে গেল অলিখিত।

দেলেয়ার টাংগালার সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় ২ যুগ আগে। তখন তিনি এক টগবগে যুবক। সে সময় তার সঙ্গে নবীন, প্রবীণ লেখকদের ঘনিষ্ঠ সখ্য ছিল। টাঙ্গাইলের কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষকসহ গুণীজনদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল।

একজন সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে সাহিত্যাঙ্গনে অনেকের নিকট সে দাদা ভাই হিসেবে পরিচিত ছিল। আমি নিজেও তাকে দাদাভাই বলে ডাকতাম। মূলত সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন বহুসাহিত্য অনুষ্ঠানের নেপথ্যের নায়ক। তার মৃত্যুতে আমরা একজন সাহিত্যপ্রেমীকে হারালাম।

নিবেদিত প্রাণ ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালার লেখক জীবনের কিছু সঞ্চয় এবং প্রজ্ঞা দিয়ে ‘হোদল বনের হাতি’ ও ‘শিউলী ঝরা মজার ছড়া’ নামে দুটি ছড়া গ্রন্থ প্রকাশ করে গেছেন। অনেক সনামধন্য সম্পাদকের সম্পাদিত গ্রন্থেও তার লেখা প্রকাশ হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- যাযাবর মিন্টু ও রোমান ইয়াসমীন সম্পাদিত ‘ভালবাসার রৌদ্রছায়া’, ‘ভালবাসার কবিতা’ এবং ‘আমার ছেলেবেলা’, মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘টাঙ্গাইলের কবি ও কবিতা, ‘টাঙ্গাইলের নির্বাচিত ছড়া’ মামুন তরফদার সম্পাদিত টাঙ্গাইলের ছড়া ও টাঙ্গাইলের ছড়া ও কবিতা।

এছাড়া তার একটি গবেষণা গ্রন্থ ‘ঘাটাইলের জনজীবন ও সংস্কৃতি’ প্রকাশনাধীন রেখে গেছেন। সাহিত্যপ্রেমী দেলোয়ার টাংগালাকে যারা খুউব কাছে থেকে দেখেছেন তারা শুধু বুঝবেন জীবনে কত কাজ বাকি রেখে গেলেন। সাহিত্যপ্রেমীরা তার কতটা আপন ছিলেন।

ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালার ছিল মানুষকে মুগ্ধ করার মতো ব্যবহার। বাচনভঙ্গি ছিল চমৎকার। কথা বলার সময় মনে হতো নাটকের সংলাপ বলছেন। দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন সুন্দর মনের সুদর্শন এ মানুষটি।

অসুস্থ ছড়াকারকে দেখতে একদিন দুপুরে বাসায় গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক ও আইনজীবী বিষ্ণু প্রিয় দীপ ও ছাত্রনেতা রেজাউল করিম লিটন। সেদিন আমাকে উদ্দেশ্য করে দেলোয়ার টাংগালা বলেন, বকুল সমাজের নিভৃতে প্রচার বিমুখ, গুণী-মেধাবী, সমাজ সচেতন অনেক মানুষের জীবন গাঁথা তোমার কলমের স্পর্শে বেরিয়ে আসতে দেখি। কোন আলোচিত সমাজকর্মী, কবি, লেখক মারা গেলে দরদমাখা শ্রদ্ধাঞ্জলী লেখ। মানুষকে সম্মান জানানোর মতো বড় মাপের হৃদয়ের অধিকারী তুমি।

এবার অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে বললেন, সবার সম্পর্কে লিখছ খুবই ভালো কথা পাশাপাশি নিজের কিছু মৌলিক লেখা লিখো। না থাক! কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, আমি মারা গেলে হয়তো …………. ।

সাহিত্য প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও কর্মব্যস্ততার কারণে ছড়াকার দেলোয়ার টাংগালা খুব বেশি লেখায় মনোনিবেশের সুযোগ পাননি। তবে অনেক নবীণ খেলককে তিনি লেখার প্রেরণা জুগিয়েছেন। নিজে লেখার সুযোগ না পেলেও অপরকে লেখনী ধরতে অনুপ্রাণিত করেছেন।

গুণী এ ছড়াকারের ব্যাপারে আমাদের সাহিত্য আড্ডার অপূরণীয় ক্ষতি হলো। আমি ব্যক্তিগতভাবে হারালাম শ্রদ্ধা-মমতায় ভরা সৃজনশীল আলোকিত একজন মানুষকে। জানি না দেলোয়ার টাংগালা নির্দিষ্ট জীবনসীমায় গৌরবময় কর্ম দিয়ে নিজের জীবনকে কতটা মহিমান্বিত করে গেছেন।

তবে এ কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায়, তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে।

১৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার আছরের নামাজের পর গালা মসজিদ মাঠে নামাজে জানাজা শেষে তাকে গালা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

আনোয়ার হোসেন বকুল# লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ