আজ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ঘাটাইল বনাঞ্চল থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় অর্ধশত প্রজাতির ঔষধি গাছ

ঘাটাইল সংবাদদাতাঃ টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের ঘাটাইল গুইলার পাহাড়ের অংশের বি¯তৃত বনাঞ্চল থেকে গত চলি­শ বছরে কম পক্ষে ৫০ প্রজাতির ঔষধি গাছ ও লতা গুল্ম জাতীয় গাছ হারিয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অদুর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের অবশিষ্ট প্রজাতির ঔষধি গাছ গুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ধ্বংস হয়ে যাবে এ অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব ঔষধি গাছের জ্ঞান যা তারা বংশ পরম্পরায় অর্জন করেছিল।

অনুসন্ধানে জানাযায়, মধুপুর গড়ের ঘাটাইল গুইলার পাহাড় অংশের শাল-গজাড়ির বনের ফাঁকে ফাঁকে এক সময় কম পক্ষে অর্ধশত প্রজাতির ঔষধি গাছ ও লতাগুল্ম পাওয়া যেত। এগুলোর মধ্যে অর্জুন,বহেড়া,হরিতকি,পিপুল,বানরলাঠি,(সোনালু)শটী,আমলকী,চান্দারমূল,সর্পগন্ধা,গোক্ষরকাটা,ভুইকুমড়া,সোনাপাতা,রাখালশসা,যজ্ঞডুমুর,ষষ্ঠীমধু,বচ্,সিটকীগোটা,একাঙ্গী,মৌডাল,কতবেল,শতমুল,তেজবল,অশোক,তোকমা,ইসুফগুল,যত্রিক,চালমুগড়া,কালোমেঘ,তেলাকুচা,ছাতিম,গুলঞ্চ,তরুকলা,দন্দকলস,একলা কানাই প্রভৃতি উলে­খ যোগ্য। এ সব লতাগুল্ম মানুষজন নানা ঔষধি কাজে ব্যবহার করত। স্থানীয় কবিরাজরা এ বন থেকে ঔষধি গাছ সংগ্রহ করে বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রি করত।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই গড়াঞ্চলে ব্যাপক হারে লুটপাট শুরু হয়। একদিকে বন লুট অপর দিকে ভুমি দখলের ফলে এ অঞ্চলে ঔষধি গাছের বিশাল সম্পদ এখন হুমুকির সন্মুখীন। ঘন শাল বনের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে ওঠা ঔষধি গাছ এবং বিচিত্র লতা গুল্মের ঝোপঝাড় এখন আর নজরেই পড়ে না।

২০১০ সালের পর এ বনে পিপুল,বানরলাঠি এমনকি গুলঞ্চলতাও দেখেন না বলে জানালেন,ঘাটাইলে বিশিষ্ট ভেষজ চিকিৎসক মো.লিয়াকত আলী (৭০)। এ ব্যাপারে লিয়াকত আলী তার স্মৃতিচারণ করে বলেন,১৫ থেকে ২০ বছর আগে এ বনের ভিতর মুল্যবান ঔষধি গাছ পাওয়া যেতো। সে সময় তিনি প্রায় ৫০ প্রজাতির ঔষধি গাছ দেখেছেন। অথচ চলতি বছর ফেব্র“য়ারি মাসে সারা দিন ঘুরে সে শুধু শটি আর মৌডাল গাছ পেয়েছে। অনেক খুজলে হয়তো আরও দু-একটি লতাগুল্ম পাওয়া যেত। তবে তা পাওয়া খুব দূর্লভ। স্থানীয় বন বিভাগ সূত্র জানায়,গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় এ বনের ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃত্রিম বন সৃষ্টি করা হয়। বিদেশী প্রজাতির ইউক্যালিপ্টাস ও আকাশমণি গাছ দিয়ে কৃত্রিম বন সৃজনের ফলে এ এলাকার ঔষধি গাছগুলো হারিয়ে গেছে। বিদেশী গাছগুলো এ বনের হাজার বছরের জীব বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সাধারনত বিদেশী গাছের নীচে কিংবা আশেপাশে দেশী গাছপালা ও লতাজাতীয় গাছ জন্মায়না। এমনকি শাল-গজারির বনের স্বাভাবিক ঝোপঝাড় গুলোও এসব গাছের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

ঘাটাইল বাজারের আর্শীবাদ কবিরাজি স্টোরের মালিক নিরঞ্জণ কর্মকার জানান, বর্তমানে এ বনে চার-পাঁচ প্রজাতির ঔষধি গাছ সামান্য পরিমানে পাওয়া যায়,তাও আবার সেগুলো ব্যাক্তি উদ্যোগে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এ বনের আদি প্রজাতির গাছপালা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন শালিয়াবহ গ্রামের আব্দুল আজিজ। তিনি জানান,আগ্রাসী প্রজাতির গাছ বাদ দিয়ে যদি দেশী প্রজাতির ফলদ গাছ লাগানো হতো তাহলে ঔষধি গাছগুলো যেমন টিকে থাকতো তেমন বনের পাখিগুলোও টিকে থাকতো। বিদেশী গাছে পাখিও বাসা বাঁধে না। ব্যাক্তি উদ্যোগে আজিজ কমপক্ষে ৩৫ জাতের ঔষধি গাছের বাগান করেছেন। প্রতিদিন অনেকে তার কাছে বিভিন্ন গাছের লতা, পাতা,ডাল ও শিকড় নিতে আসেন।

প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বি¯তৃত ঘন শালবনে এক সময় যে বিচিত্র বৃক্ষলতা পাওয়া যেত তা এ অঞ্চলের বয়স্ক মানুষের কাছে এখন শুধুই স্মৃতি।

প্রকৃতিক বনের উপর বিদেশী প্রজাতির গাছের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে ঘাটাইল উপজেলা রেঞ্জ অফিসার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন,বনের দেশী প্রজাতির লতা গুল্ম জাতীয় গাছ ধ্বংস হয়েছে মুলত বনের ভিতর মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ার কারনে। স¤প্রতি সমতল এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ বনের প্রান্তে এসে বাড়িঘর করছে। ফলে বনের প্রাণ বৈচিত্র ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। । ঔষধি গাছ ও লাতা গুল্ম জাতীয় গাছ রক্ষায় বন বিভাগের কোন প্রকার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,সরকার এখন দেশি প্রজাতির গাছপালা দিয়ে বনায়নের উপর গুরত্ব দিচ্ছে। বনের ভিতর যাতে মানুষ চলাচল করতে না পারে সে জন্য বেতকাটা রোপন করা হচ্ছে। এরফলে ঔষধি গাছ রক্ষা পাবে বলে তিনি মনে করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ