আজ ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রং নাম্বারে প্রেম, দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা আটক ৪

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে সড়কের পাশে গত ৩ আগস্ট পাওয়া বস্তাবন্দি অজ্ঞাত তরুণীর হত্যা রহস্য জানিয়েছে পিবিআই পুলিশ। এ ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এসএসসি পরীক্ষার্থী খোদেজা আক্তারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে রং নম্বরে পরিচয় হয় নরসুন্দর (নাপিত) কৃষ্ণ চন্দ্র দাসের (২৮)। নাম পরিচয় গোপন করে নিজেকে ব্যবসায়ী বলে সানি নাম ব্যবহার করে ওই ছাত্রীর সঙ্গে মোবাইলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস। এক পর্যায়ে তারা দুজনেই দেখা করতে চায়। দেখা করার পর একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয় খোদেজা। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। লাশ বস্তাবন্দি করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এনে রাস্তার পাশে ফেলে যায়। পরদিন লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ।

রোববার (৮ আগস্ট) বিকেলে বস্তাবন্দি তরুণীর লাশের খুনের রহস্য জানান, টাঙ্গাইলের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশন (পিবিআই) পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সিরাজ আমীন। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন, গোপালপুর উপজেলার বেঙ্গুলা গ্রামের মৃত নগেন চন্দ্র দাসের ছেলে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ওরফে সানি, ধনবাড়ী উপজেলার ইসপিনজারপুর গ্রামের মো. মোশারফ হোসেনের ছেলে সৌরভ আহম্মেদ হৃদয় (২৩), একই গ্রামের মো. গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মো. মেহেদী হাসান টিটু (২৮) ও মৃত মজিবর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান (৩৭)।

রোববার (৮ আগস্ট) বিকেলে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারক আরিফুল ইসলামের আদালতে আসামিরা নিজের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, রং নম্বরে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে খোজেদা ও কৃষ্ণ দাসের পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রেমও হয়। কৃষ্ণ দাস দেখা করতে চাইলে খোজেদা রাজি হয়। বিষয়টি কৃষ্ণ দাস তার পরিচিত সৌরভ আহমেদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান টিটুকে অবগত করে। তারা তিনজনে পরামর্শ করে ধনবাড়ী উপজেলার চালাষ মধ্যপাড়া গ্রামে মিজানের ভাড়া বাসা সাড়ে ৭ হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে। গত ২ আগস্ট খোদেজা কৃষ্ণ দাসের সঙ্গে গোপালপুর ব্রিজে দেখা করতে যায়। সেখানে কৃষ্ণ দাস খোদেজাকে রেষ্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়। সৌরভ আহমেদ হৃদয় তার মোটর সাইকেলে কৃষ্ণ দাস ও খোদেজাকে বসিয়ে রওনা হয়। কিন্তু রেষ্টুরেন্টে না গিয়ে কৃষ্ণ দাস ধনবাড়ী মিজানের বাসায় যায়। খোদেজা বিষয়টি জানতে চাইলে কৃষ্ণ দাস জানান, মিজান তার বন্ধু। আরেক বন্ধু এখানে খাবার নিয়ে আসবে। এখানের বন্ধুর স্ত্রী সন্তান আছে। ভয়ের কিছু নেই, খারাপ কিছু হবে না। বাসার একটি কক্ষে খোদেজা ও কৃষ্ণ দাস আলাপ শুরু করে। বাইরে সৌরভ আহমেদ হৃদয় ও মিজানুর রহমান বাহিরে অপেক্ষা করতে থাকে। বিকেলে এক পর্যায়ে কৃষ্ণ দাস খোদেজাকে জোর পূর্বক ধর্ষণ করে। খোদেজা তখন বুঝতে পারেন সে হিন্দু ছেলে। খোদেজা কৌশলে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ভয়ভীতি ও শারীরিক নির্যাতন করে কৃষ্ণ দাস। কৃষ্ণ দাস তাকে পূণরায় ধর্ষণের চেষ্টা করলে সে চিৎকার, চেচামেচি শুরু করে। তাকে একাধিকবার ধর্ষণের করার পর সে কান্না শুরু করে। তখন কৃষ্ণ তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে।

মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, লাশ গুম করার জন্য তারা ১৫০০ টাকার বিনিময়ে একটি সিএনজি ভাড়া করে। পরে কৃষ্ণ চন্দ্র দাস, হৃদয় ও মিজান কক্ষের ভিতরেই তার লাশ বস্তাবন্দি করে। মিজান সিএনজি চালিয়ে লাশ পিছনে নিয়ে যমুনা ফেলার উদ্দেশে কৃষ্ণ দাস ও মিজানকে নিয়ে রওনা দেয়। তারা লাশটি ভূঞাপুর বীর ভরুয়া গ্রামের সড়কের পাশে ফেলে রেখে চলে যায়। তবে খোদেজার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ভানিটি ব্যাগ যমুনায় ফেলে দেয়। ৩ আগস্ট পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয়ে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে ভূঞাপুর ছাব্বিশা কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেন।

এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা খোকন মন্ডল বাদি হয়ে গত ৬ আগস্ট ভূঞাপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনার পর রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশনের (পিবিআই) পুলিশ পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান আনছারীসহ পুলিশের একটি দল বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শনিবার (৭ আগস্ট) আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

মেয়ের বাবা খোকন মন্ডল বলেন, আমার মেয়ে নানির বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ২ আগস্ট বাড়ি থেকে বের হয়। তার নানির বাড়ি গিয়ে সেখানে থেকে কসমেটিক কেনার জন্য বের হয়। এর পর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আমার মেয়েকে ধর্ষণ শেষে হত্যার পর আসামিরা তার লাশটিও দেখতে দেয়নি। তার লাশটি দাফনও করতে পারিনি আমরা। যারা আমার মেয়ের এতো বড় ক্ষতি করেছে আমি তাদের ফাঁসি দাবি করছি।

পুলিশ সুপার বলেন, এ ঘটনায় লাশ গুমের কাজে ব্যবহৃত সিএনজি জব্দ করা হয়েছে। আসামিরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এরপর তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ বিভাগের আরো সংবাদ